আফ্রিকার কৃষি খাতে বাংলাদেশী বিনিয়োগের সম্ভাব
পশ্চিম আফ্রিকার আইভরিকোষ্ট দেশটি আয়তনে বাংলাদেশের দ্বিগুনের ও একটু বেশী হলেও জনসংখ্যা মাত্র ৩ কোটি । প্রতি বর্গ কিলোমিটারে মাত্র ৩৯ জন লোকের বসবাস । আফ্রিকা মহাদেশে অবস্থিত হওয়া স্বত্বেও দেশটি সবুজে শ্যামলে ঘেরা । এদেশের পরিবেশ , জলবায়ু ও ভূপ্রকৃতির সাথে বাংলাদেশের বেশ সাদৃশ্য রয়েছে । শুধুমাত্র মানুষের গায়ের রং আর বেশভূষা দেখেই বোঝা যায় এটা আফ্রিকা । এ বিশাল দেশটিতে রয়েছে অজস্র বনজ আর খনিজ সম্পদের সমাহার । পাশাপাশি রয়েছে মাইলের পর মাইল বিস্তীর্ণ অনাবাদী কৃষিজমি । ১৯৬০ সালে দেশটি ফরাসী উপনিবেশ হতে স্বাধীনতা প্রাপ্ত হয় । স্বাধীনতার পর প্রথম প্রেসিডেন্ট ফেলিক্স হুফে বাউনির নেতৃত্বে ১৯৬০ – ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত দেশটিতে নিরবছিন্ন শান্তি বিরাজমান ছিল এবং প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক সম্রিধ্বি ও লাভ করেছিল তখন । ১৯৮৭ সালে আইভরিকোষ্টের মোট জি ডি পি র ৩৫% এবং মোট রপ্তানি আয়ের ৬৬% এসেছিল কৃষি খাত থেকে । দেশে মোট স্বাবলম্বী জনসংখ্যার তিন ভাগের দুই ভাগ কৃষি খাতে নিয়োজিত ছিল । ১৯৬৫ – ১৯৮০ সাল পর্যন্ত এ দেশের রপ্তানি আয়ের ৫০% ই এসেছে কফি , কোকো আর টিম্বার হতে । কিন্তু ১৯৯৯ সালে রবার্ট গুয়ে কর্তৃক সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে দেশটি তে যে রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হয়েছিল তার রেশ কাটেনি আজও । ফ্রান্সের কলোনিজম থেকে বহু বছর আগে মুক্তি পেলেও ফরাসী রা এখনও এদেশের ঘাড়ে চেপে রয়েছে সিন্দাবাদের ভূতের মত । বর্তমান প্রেসিডেন্ট আলাসান ওয়াতারার শ্বশুর বাড়ি ফ্রান্সে হবার সুবাদে এদেশে উৎপাদিত কফি , কোকো , রাবার , টিম্বার সহ সোনা , হীরা ইত্যাদি যাবতীয় খনিজ সম্পদের সিংহ ভাগ চলে যায় ফ্রান্সে । শুনেছি চুক্তি অনুযায়ী আইভরিকোষ্ট ১০% পায় , আর বাকিটা নিয়ে যায় ফরাসীরা । কি অদ্ভুত বৈষম্য ! অথচ সামান্য খাবারের আশায় কত গরিব আইভরিয়ান কে দেখেছি হাতে আনারস , আম , পেঁপে , কলা ইত্যাদি ফল হাতে নিয়ে আমাদের দিকে তীর্থের কাকের মত চেয়ে থাকতে । এ সবের বিনিময়ে সে পেতে চায় বিস্কুট ভাত , মুরগীর চামড়া কিংবা আটা । আমাদের দেখলেই ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাংলায় তারা বলতে থেকে -”মনামি(মানে বন্ধু) , মিষ্টি আনারস আছে , কাঁচা মরিচ আছে , বিস্কি লাগবে বিস্কি ” বিস্কুট এদের অত্তাধিক প্রিয় খাবারের একটি । হুট করে মনে পড়ে গেল , এ ফরাসীরা তো এক সময় দোর্দণ্ড প্রতাপে ভারতীয় উপমহাদেশ ও শাসন করেছিল ।
বর্তমানেও আইভরিকোষ্টের মুষ্টিমেয় জন গোষ্ঠীর পেশা কৃষি । কফি , কোকো , রাবার এদের মূল অর্থকরী ফসল হলেও এদেশে বিভিন্ন প্রকার খাদ্য শস্য উৎপাদিত হয় । যেমন ধান ,গম , ভুট্টা , আখ , মরিচ , ইয়াম , কাসাবা (আলু জাতীয় ফসল ) , মিষ্টি আলু , কাজু বাদাম , পিনাট , সরগাম , শ্যালট ইত্যাদি । এছাড়া এদেশে তুলা , কলা , আম , আনারস ইত্যাদির ব্যাপক ফলন হয়ে থাকে । আটলান্তিক মহাসাগরের তীরে অবস্থিত বিধায় এখানে নারিকেল এবং পাম চাষের ও রয়েছে বিপুল সম্ভাবনা । কিন্তু দুঃখের বিষয় , রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারনে দেশ টীতে কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আসেনি । খাদ্য উৎপাদনেও দেশটি হতে পারেনি স্বয়ং সম্পূর্ণ । অথচ এদেশের ভূপ্রকৃতি , জলবায়ু , সাশ্রয়ী শ্রম মূল্য সবই রয়েছে কৃষি বাণিজ্যের অনুকূলে । পরিবেশ ও ভু প্রাকৃতিক সাদৃশ্য থাকায় বাংলাদেশে উৎপাদিত প্রায় সব ধরনের অর্থকরী ফসল , খাদ্যশস্য , শাক -সবজি সবই এদেশে ফলানো সম্ভব । আইভরিয়ান রা বাড়ির আশেপাশে অল্প পরিসরে ডাল , ভুট্টা , কলা , কাসাবা , ইয়াম সহ সব ধরনের শাক – সব্জির আবাদ করে থাকে । ফলন ও হয় প্রচুর । জমি উর্বর বিধায় রাসায়নিক সারের তেমন দরকার পড়েনা । এদেশে ঘাস , লতাপাতা , বন – জঙ্গলের আধিক্য থাকায় এগুলিকে বৈজ্ঞানিক পদ্বতিতে পচিয়ে কমপোষ্ট সার তৈরি করে রাসায়নিক সারের বিকল্প হিসাবে ব্যাবহার করা যায় । আর ফসলের রোগ বালাই দমনে এদেশে কীটনাশকের প্রয়োজন হয় কম । কারন , এদেশের পোকা মাকড় , কীট পতঙ্গ সমূহ কীটনাশকের প্রতি অতি মাত্রায় সংবেদনশীল । বাংলাদেশে আজকাল এরোসল স্প্রে করলেও কোন মশা মরেনা । অথচ সামান্য স্প্রে তে আইভরিয়ান মশা কিভাবে কুপোকাত হয় তা নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাস হবেনা । আইভরিকোষ্টের জনগন শারীরিক ভাবে বাংলাদেশী দের তুলনায় অনেক বেশী কষ্ট সহিষ্ণু ও কর্মঠ । এ পরিশ্রমী জনগোষ্ঠী কে সঠিক ভাবে কৃষি ক্ষেত্রে কাজে লাগাতে পারলে খাদ্য শস্য উৎপাদনে আশানুরুপ ফলাফল লাভ সম্ভব । তাছাড়া শ্রম মূল্য সাশ্রয়ী বিধায় এদেশে ফসল উৎপাদন ব্যয় ও হবে তুলনা মূলক ভাবে কম ।
এখন আমাদের ভাবতে হবে আফ্রিকার এ সম্ভাবনা ময় খাতে বিনিয়োগ করে কিভাবে সর্বচ্চ সুফল পাওয়া যায় । প্রথমে সরকারি পর্যায়ে দ্বিপাক্ষিক আলাপ আলোচনার মাধ্যমে কৃষি জমি লীজ সংক্রান্ত বিষয়ে আইভরিয়ান সরকারের নীতিগত অনুমোদন নিতে হবে । জমি লীজের অনুমোদন প্রাপ্তির পর কৃষি মন্ত্রীর নেতৃত্বে উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করতে হবে । এ কমিটির কাজ হবে আইভরিকোষ্টের কৃষি খাতে বিনিয়োগের সম্ভাব্যতা যাচাই করে বিনিয়োগের বিস্তারিত রূপরেখা প্রণয়ন করা । এ কমিটি তে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ব বিদ্বালয় , কৃষি গবেষণা ইন স্ট ি টিউট সহ কৃষি অধিদপ্তরের যোগ্য ও মেধাবী কৃষি বিদদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে । তারা প্রয়োজনে আইভরিকোষ্টের পরিবেশ , জলবায়ু , সয়েল টেস্ট ইত্যাদি পর্যালোচনা করে যে সকল ফসল বাণিজ্যিক ভাবে চাষাবাদ লাভজনক হবে তা নির্ধারণ করে সরকারের নিকট সুপারিশ করবেন । উৎপাদিত ফসল যদি ৫০-৫০ হারে বণ্টনের চুক্তি ও করা হয় তাতেও বাংলাদেশ লাভবান হবে । যে জাতি ফ্রান্সের সাথে ১০%-৯০% চুক্তি করতে পারে তাদের কাছে ৫০%-৫০% প্রস্তাব নিশ্চয়ই লোভনীয় হবে । সরকার চাইলে নীতিমালা করে এ খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ কেও উৎসাহিত করতে পারে । তখন BRAC ,PROSHIKA সহ অন্যান্য আগ্রহী এন জি ও আইভরিকোষ্টের কৃষি খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে তাদের কৃষি বাণিজ্য কে সম্প্রসারিত করতে পারবে । বিনিময়ে আয় হবে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা । বর্তমান আর্থ- সামাজিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে কৃষি ক্ষেত্রে Out sourcing উপেক্ষা করার মত কোন বিষয় নয় । খাদ্যে স্বয়ং সম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষে দেশে উচ্চ ফলনশীল Hi breed খাদ্য শস্য চাষাবাদ সহ সরকারী পর্যায়ে ন্যায্য মূল্যে কৃষকের উৎপাদিত ফসল ক্রয় করে তাকে মুনাফাখোর মধ্যস্বত্ব ভোগীদের হাত থেকে রক্ষা করার পাশাপাশি আফ্রিকার উর্বর , অনাবাদী , কৃষি জমিতে চাষাবাদের বিষয়টি সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল সক্রিয় বিবেচনায় রাখলে কাঙ্ক্ষিত লক্ষে পৌঁছানো অবশ্যই সম্ভব । তবেই আমরা দেশের সার্বিক পরিবর্তন ঘটাতে পারব ।জাতি হিসাবে বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবো । গর্ব ভরে বলতে পারবো দেশে কোন খাদ্য ঘাটতি নেই – দেশ আজ খাদ্যে স্বয়ং সম্পূর্ণ্র।জুলাই 16th, 2012
No comments:
Post a Comment