বৈদেশিক বাণিজ্য:
বৈদেশিক বাণিজ্যে সাধারণত দেশের উদ্বৃত্ত কৃষি ও শিল্পজাত দ্রব্য বিশ্বের অন্যান্য দেশে রপ্তানি এবং দেশের চাহিদা অনুসারে বাইরের দেশ থেকে কোনো পণ্য আমদানি করা হয়। ভারত, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ইতালি, ফ্রান্স, সুইডেন, রাশিয়া, জার্মানি, ইন্দোনেশিয়া, নেপাল, মিয়ানমার, থাইল্যান্ডসহ প্রায় ৪০টি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক চুক্তি আছে। এসব দেশে আপনি বৈদেশিক বাণিজ্য করতে পারেন। বর্তমানে ছোট-বড় আমদানি ও রপ্তানিকারকদের বাণিজ্যের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে। আর আগের তুলনায় অনেক সহজ হয়ে গেছে বৈদেশিক বাণিজ্য। মো. জাহিদ হোসাইন বলেন, এখন আর দেশের বাইরে গিয়ে বাণিজ্য করতে হচ্ছে না, দেশে বসেই বৈদেশিক বাণিজ্য করা যাচ্ছে। এতে আর্থিক লেনদেন হচ্ছে ব্যাংকের মাধ্যমে।
রপ্তানি বাণিজ্য:
রপ্তানি বাণিজ্যে দেশের কোনো পণ্য বিদেশে সরবরাহ করা হয়। বাংলাদেশের রপ্তানি দ্রব্যের সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাজ্য। এ ছাড়া ভারত, জাপান, চীন, মিয়ানমার, মালয়েশিয়া প্রভৃতি দেশেও রপ্তানি বাণিজ্যের প্রচলন আছে। হংকং, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিসর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, হল্যান্ড, পোল্যান্ড প্রভৃতি দেশও বাংলাদেশি পণ্যের গ্রাহক। বাংলাদেশের রপ্তানি দ্রব্যের সিংহভাগই কৃষিজাত দ্রব্য। আপনি পাট, চামড়া, চা, তামাক, চিংড়িসহ সব ধরনের কৃষিজ পণ্য বিদেশে রপ্তানি করতে পারেন। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বিশ্ববাজারে বেশ চাহিদা আছে। এ ছাড়া ওষুধও দেশের বাইরে রপ্তানি হচ্ছে। ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প, পাটজাত পণ্য, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, কাগজ, রেয়ন, হার্ডবোর্ড−এসব শিল্পজাত দ্রব্যও বিদেশে রপ্তানি করতে পারেন।
রপ্তানি করতে চাইলে যা করতে হবে:
বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো সুত্রে জানা যায়, রপ্তানিকারক হতে চাইলে প্রথমে আমদানি-রপ্তানি নিয়ন্ত্রকের দপ্তরে নিবন্ধন করতে হবে। রপ্তানি নিবন্ধন সনদপত্র পেতে ট্রেড লাইসেন্স ও আনুষঙ্গিক কাগজপত্রসহ আবেদন করতে হবে। সনদপত্র পাওয়ার পর কাছের রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো অফিসে যোগাযোগ করতে পারেন। প্রতিষ্ঠানটি বিদেশি উৎসাহী ক্রেতাদের তালিকা সরবরাহ, পণ্যের বিদেশের বাজার অনুসন্ধান, বিদেশের বাজারে পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক মূল্য সরবরাহ, ব্যবসাসংক্রান্ত বিদেশভ্রমণের সুযোগ করে দেওয়াসহ বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা করে থাকে। রপ্তানি করতে চাইলে পণ্যের বিবরণ, রপ্তানিমূল্য প্রভৃতি তথ্যসহ স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব সরাসরি আগ্রহী ক্রেতাদের কাছে পাঠাতে হবে। তবে পণ্য রপ্তানির সময় চুক্তি করে নিতে হবে। আর পণ্য শিপমেন্টের আগে রপ্তানি চুক্তির অনুলিপি, ঋণপত্রের অনুলিপি, রপ্তানি ফরম, ইনভয়েস, প্যাকিং লিস্ট, পরিবহন বিল, রপ্তানির বিল প্রভৃতি দাখিল করতে হবে। এ ছাড়া পণ্যভেদে বিভিন্ন সনদেরও প্রয়োজন হতে পারে। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই সরকারের ‘রপ্তানি নীতি ২০০৬-’০৯ মেনে চলতে হবে।
বৈচিত্র্য আনতে পারেন রপ্তানি বাণিজ্যে:
এমন একটি সময় ছিল, তখন রপ্তানি বলতে কেবল পাট ও পাটজাত দ্রব্য, চামড়া, চা, পোশাকশিল্প−এসব হাতেগোনা কিছু পণ্য ছাড়া অন্য কিছুর কথা মাথায় আসত না। কিন্তু বর্তমান সময়ে পাল্টে গেছে ধারণা। দেশে অপ্রচলিত অথচ বিদেশে চহিদা আছে এমন দ্রব্য বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা যায়। এসব বিষয়ে দৃষ্টি দিয়ে আপনিও বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য আনতে পারেন। তাজা মাছ, শুঁটকি মাছ এসব তো বটেই, ব্যাঙের পা, কাঁকড়া, চিংড়ি, তেঁতুলের বীজ, পান, সুপারি, শাকসবজি, ফলমূল, নারকেলের ছোবড়া ও গাছের শেকড়-বাকল থেকে তৈরি বিভিন্ন পণ্য−এসব নানা অপ্রচলিত পণ্য রপ্তানি করতে পারেন।
রপ্তানি বাণিজ্যে নানা সুবিধা:
দেশিয় পণ্য বিদেশে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা যায়। এতে বাড়ে দেশের প্রবৃদ্ধির হার। সরকার রপ্তানিকারকদের নানাভাবে সহযোগিতা দিয়ে আসছে। রপ্তানি ঋণ, রপ্তানি বোনাস স্কিম, রপ্তানি শুল্কহ্রাস, রপ্তানি শুল্ক মওকুফ, রপ্তানি পাওনা গ্রান্টি স্কিম, বন্ড সুবিধা, নগদ আর্থিক সহায়তা প্রভৃতি সুযোগ-সুবিধা দিয়ে তাঁদের উৎসাহিত করা হচ্ছে। বিশেষ করে দেশের অপ্রচলিত পণ্য রপ্তানিকারকদের ব্যাপক সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো, আমদানি ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রকের দপ্তর, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, সাধারণ বীমা করপোরেশন, স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ, বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক, বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন, বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশন, শিল্প ও বণিক সমিতি এবং ট্রেড অ্যাসোসিয়েশনগুলো রপ্তানির নানা বিষয়ে আপনাকে সহযোগিতা করতে পারে।
আমদানি বাণিজ্য:
দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে কোনো পণ্যের ঘাটতি থাকলে সাধারণত আমদানি বাণিজ্য করা হয়। তবে কোনো পণ্যের চাহিদা সৃষ্টি করেও সেটির বাজার দখল করতে পারেন। বাংলাদেশ অনেকাংশেই আমদানিনির্ভর দেশ। বিভিন্ন ধরনের নির্মাণসামগ্রী, শিল্প-কারখানার জন্য বিভিন্ন কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি, পরিবহনসামগ্রী, টেলিভিশন, এয়ারকন্ডিশনার, ওভেন, রেফ্রিজারেটরসহ বিভিন্ন গৃহসামগ্রী, খনিজ তেল, ভোজ্যতেল, চর্বি, রাসায়নিক দ্রব্য, ওষুধ, খাদ্যশস্য, শিশুখাদ্য, পানীয় দ্রব্য−এ ধরনের অনেক কিছুই আমাদের বাইরের দেশ থেকে আমদানি করতে হয়। আপনিও এসব পণ্য আমদানি করে দেশে বাজারজাত করতে পারেন। তবে কোন কোন বিদেশি পণ্য বাজারজাত করা হলে দেশি পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে না এবং দেশের মানুষের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে, তা ভেবেচিন্তেই এগোতে হবে।
আমদানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে যা করতে হবে:
মো. জাহিদ হোসাইন আরও জানান, কোনো পণ্য আমদানি করতে হলে প্রথমে আপনাকে ঠিক করতে হবে, আপনি কোন পণ্য আমদানি করবেন। সে অনুযায়ী রপ্তানিকারকদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। এরপর রপ্তানিকারকের সঙ্গে বসে নিজের চাহিদা জানাতে হবে ও দেশের কর কাঠামোকে মাথায় রেখে পণ্যের মূল্য স্িথর করতে হবে। রপ্তানিকারক পণ্যের পর্যাপ্ততা অনুযায়ী ‘প্রফরমা ইনভয়েস’ পাঠাবে। সে অনুযায়ী আমদানিকারককে ব্যাংকে ঋণপত্র খুলতে হবে। এরপর রপ্তানিকারক তাঁর পণ্য পাঠাবেন। অর্থের লেনদেন হবে দুই পক্ষের দুটি ব্যাংকের মাধ্যমে। আমদানি করতে হলে সরকারকে আমদানি কর, সম্পুরক কর, মূল্য সংযোজন কর ও অগ্রিম আয়কর দিতে হবে। এ বিষয়ে সরকারের ‘আমদানি নীতি আদেশ, ২০০৬-০৯’ মেনে চলতে হবে।
আমদানিতে প্রাধান্য পাবে যেসব পণ্য:
যেসব পণ্য বা পণ্যসামগ্রী দেশেই উৎপাদন সম্ভব বা দেশেই উৎপাদিত হচ্ছে, সেসব পণ্য আমদানি না করে যেসব পণ্যের প্রকৃত অর্থেই চাহিদা ও ঘাটতি রয়েছে, সেসব পণ্য আমদানি করার দিকে মনোযোগী হতে হবে। তবেই দেশীয় শিল্প উৎসাহিত হবে ও দেশি শিল্পের বিকাশ ঘটবে। এ ছাড়া বিলাসজাত দ্রব্য আমদানি থেকে বিরত থাকতে হবে। রপ্তানি অপেক্ষা দেশে আমদানির পরিমাণ বেশি হলে বৈদেশিক বাণিজ্যে লেনদেনের ভারসাম্য ব্যাহত হয়। তাই দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির স্বার্থেই আমদানি কমিয়ে কীভাবে রপ্তানি বাড়ানো যায়, সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে। তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পাশাপাশি দেশের শিল্পায়নের স্বার্থে বিভিন্ন প্রকার কলকবজা, যন্ত্রপাতি, খুচরা যন্ত্রাংশ ও প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে প্রাধান্য পেতে পারে।
আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহন ও যোগাযোগব্যবস্থা:
বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের শতকরা ৮০ ভাগ পণ্য সমুদ্রপথে আসে বা যায়। কেবল পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ও নেপালের সঙ্গে বাণিজ্য হয় স্থলপথে। বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন এবং অন্যান্য বেসরকারি নৌপরিবহন সংস্থা আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের কাজ করে থাকে। শিপিং করপোরেশনের জাহাজ যেসব আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে যাতায়াত করে সেগুলো হলো বাংলাদেশ-যুক্তরাজ্য আন্তমহাদেশীয় বাণিজ্যপথ, বাংলাদেশ-আমেরিকা মহাদেশীয় বাণিজ্যপথ, বাংলাদেশ-দুরপ্রাচ্য জাপান বাণিজ্যপথ ও বাংলাদেশ-পাকিস্তান-পশ্চিম এশিয়া উপসাগরীয় অঞ্চল ও লোহিত সাগর। চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরকে বাংলাদেশের বহির্বিশ্বের প্রবেশপথ বলা হয়। এসব নৌ-বন্দর তো বটেই, বিমানের মাধ্যমেও বিদেশ থেকে পণ্য পরিবহনের সুযোগ রয়েছে।
...................
প্রথম আলো থেকে
No comments:
Post a Comment